জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি উপেক্ষিত কেন?

জীব প্রযুক্তি বিজ্ঞান জিন প্রকৌশল মত একুশ শতককে বলা হয় জীববিজ্ঞানের শতাব্দী । স্বাভাবিকভাবেই এর সবচেয়ে অগ্রসর শাখা হিসেবে জীবপ্রযু্ক্তি বিভাগের শিক্ষার্থীরা এ সময়ের আধুনকি গবেষণা ও জ্ঞানের সাথে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। সেটা হালের সবচেয়ে আলোচিত জিন এডিটিং হোক কিংবা রোগ শনাক্ত বা ওষুধ তৈরি বা ভ্যাকসিন উদ্ভাবন হোক- সব ক্ষেত্রেই জীবপ্রযু্ক্তি সবচেয়ে অগ্রসর জ্ঞানের চর্চা করে।

সম্প্রতি কভিড-১৯ সংকটে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবপ্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পিসিআর প্রযুক্তি থেকে শুরু করে সিকোয়েন্সিং প্রজেক্ট, কম্পিউটেশনাল এনালাইসিস সবজায়গায় তারা দক্ষতার সাক্ষর রেখেছে। মলিকুলার বায়োলজি বিষয়ক অন্যান্য বিভাগের সাথে জীবপ্রযু্ক্তির শিক্ষার্থীরাও দেশের এই ক্রান্তিকালে ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে এসেছে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে এই শিক্ষার্থীদের কোন স্বীকৃতি নেই। সরকারী কোন প্রণোদনায় তাদেরকে অন্তর্ভূক্ত করা হয় নি। শুরু থেকে তারা স্বেচ্ছাসেবক ছিলো, এখনো তা-ই রয়ে গেছে। এই ধারা থেকে নিশ্চিত করেই বলা যায়, ভবিষ্যতে যদি সরকার কোন নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়, তখনও এসব শিক্ষার্থীরা উপেক্ষিত থাকবে।

সম্প্রতিকালের এই যে উপেক্ষা এটাকে বলা যায় মাত্র ‘টিপ অব দ্য আইসবার্গ’। দেশে জীবপ্রযুক্তির শিক্ষার্থীরা আরো নানানভাবেই উপেক্ষিত। তাদের অর্জিত দক্ষতা ও জ্ঞান বৃহৎ পরিসরে ব্যবহারের না আছে কোন সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগ, না আছে বিদ্যমান চাকরির ক্ষেত্রে তাদেরকে আত্তীকরণের কোন ব্যবস্থা।

স্বাভাবিক কারণেই, স্নাতকোত্তর প্রাক্তন- এবং বর্তমানে অধ্যয়নরত-শিক্ষার্থীদের ভেতর ক্রমশ হতাশা তৈরি হয়েছে। সেই হতাশা যে কেবল তাদের চাকরির অপ্রাপ্তি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা ক্যারিয়ার পরিকল্পনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে সেটা নয়। বরং মূল কষ্টটা হচ্ছে এত চেষ্টা সাধনা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে উপরের দিকে একটি বিষয়ে পড়াশোনা করেও সেই জ্ঞানটাকে উপেক্ষিত হতে দেখা। অর্থ-করি হয়তো কোন না কোন চাকরি, কোন ব্যবসা থেকে হয়ে যাবে কারো কারো, হয়তো খেয়ে পড়ে জীবনটা চলে যাবে, কিন্তু নিজের জীবনের সেরা সময়টায় অর্জিত জ্ঞানকে ব্যবহার করতে না পারার আক্ষেপটা আমৃত্যু রয়ে যাবে।

এত বছরেও জীবপ্রযুক্তি বিষয় থেকে স্নাতক/স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে কোথায় কোথায় নিযুক্ত হবে তার কোন নির্দেশনা তৈরি হয় নি। নামের সাথে ইঞ্জিনিয়ার শব্দটি থাকার কারণে কখনো কখনো তাদেরকে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদৈর সাথে একই গ্রুপে ফেলা হয়েছে। এই ভ্রান্তির বাইরে তাদেরকে আলাদা করে আর কোথাও উল্লেখ করা হয় না। কলেজ বা স্কুল পর্যায়ে জীববিজ্ঞানের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দুনিয়ার তাবত বিষয়ের উল্লেখ থাকলেও জীবপ্রযু্ক্তি থাকে না। যেন এই বিষয়টির অস্তিত্বই নেই। ফলে এ বিষয়ের শিক্ষার্থীরা নিয়োগ পরীক্ষায় অবতীর্ণই হতে পারে না। এরকম আরো অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যাবে যেখানে জীবপ্রযু্ক্তি বিভাগের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভূক্ত করার সুযোগ আছে, কিন্তু তাদেরকে বেমালুম উপেক্ষা করা হচ্ছে।

সর্বশেষ এরকম আরেকটি অত্যন্ত দৃষ্টিকটু দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে, যেখানে কভিড-১৯ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় শুরু থেকে সম্পৃক্ত থাকলেও জীবপ্রযু্ক্তিবিদদের কোন স্বীকৃতি দেয় নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর । ১০ জুন স্বাস্থ্য অধিদফতর অস্থায়ীভাবে ২০ জনকে কভিড-১৯ শনাক্তকরণের জন্য সবেতনে নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু সেখানে এতদিন ধরে কাজ করে আসা জীবপ্রযু্ক্তিবিদদের কাউ কেউ নিয়োগ দেয় নি। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় থেকে নেওয়া হয়েছে, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু জীবপ্রযু্ক্তি বিষয়ের একজন শিক্ষার্থী এই তালিকায় ঢুকতে পারলো না, সেটা একটা সুস্পষ্ট অন্যায়। এর একটা বিহিত হতে হবে।

সময় এসেছে এই আগল ভাঙার। জীবপ্রযু্ক্তিবিদদের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি, পুরনো সেক্টরগুলোতে আত্তীকরণের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন এখন অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে। এ ব্যাপারে উদারতার সাথে চিন্তা করা এবং আবিষ্কার ও উদ্ভাবন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া দরকার।

পৃথিবীর আর কোথাও কর্মসৃষ্টির সকল দায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো হয় বলে আমার জানা নেই। বাংলাদেশে আগে সাবজেক্ট খুলে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়, তারপর দেখা যায় তাদের ওই দক্ষতা সংক্রান্ত কোন কর্মক্ষেত্র নেই। এই ধারায় আজ হয়তো জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং সংকটে পড়েছে, ভবিষ্যতে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে। সুতরাং উচ্চশিক্ষার বিষয়গুলো দেশের কর্মক্ষেত্রে কীভাবে কাজে লাগানো যায় সেজন্য নিয়মিত পর্যালোচনা হওয়া দরকার। এক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো অতিসত্ত্বর বাস্তবায়ন করতে হবে তা হচ্ছে- ১. সরকারী কর্মকমিশনের চাকরি নীতিমালা পরিমার্জন ও সংশোধন, যেখানে জীবপ্রযু্ক্তি বিষয়টির প্রাসঙ্গিকতা আধুনিক সময়ের আলোকে বিবেচনা করে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভূক্ত করে দিতে হবে। ২. সরকারের কৃষি, স্বাস্থ্য, বন ও পরিবেশ সংক্রান্ত অধিদফরগুলোকে জীবপ্রযু্ক্তির প্রয়োগ নিয়ে পর্যালোচনা করতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে স্নাতক/স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের নিয়োগ দিতে হবে। বর্তমানে এই ক্ষেত্রগুলো কেবল কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজগুলোর জন্য একচেটিয়াভাবে সংরক্ষিত হয়ে আছে। বর্তমান সময়ের প্রয়োজনে ব্যাপ্তি বাড়ানো দরকার। ৩. সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করার প্রকল্প হাতে নিতে হবে। বেসরকারী পর্যায়ের উদ্যোগের জন্য সরকারী সহায়তা বা প্রনোদনা দিতে হবে। ৪. দেশীয় গবেষণা থেকে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রয়োজন মেটানোর মতো পণ্য ও প্রযু্ক্তি উদ্ভাবনে বিনিয়োগ পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। ৫. বিদেশে যারা এ বিষয়ে ভালো অবস্থান তৈরি করেছে, তাদেরকে দেশের সংশ্লিষ্ট খাত উন্নয়নে পরামর্শক বা উপদেষ্টা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। যারা দেশে ফিরতে চায় তাদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

কভিড-১৯ আমাদেরকে দেখিয়েছে কীভাবে নতুন প্রযু্ক্তির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়ছে। সারা পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের মেধাবী প্রজন্মকে সেই যাত্রায় শামিল করতে হবে। জীবপ্রযুক্তির মতো সর্বাধুনিক বিষয়কে উপেক্ষা করে আমরা সেই যাত্রায় অংশ নিতে পারবো না। এই সত্যটি স্বীকার করে সকল বৈষম্য দূর করা হোক, শুরু হোক নতুন এক উদার ও সম্ভাবনাময় পথচলা।

মুশতাক ইবনে আয়ূব

সহকারি অধ্যাপক, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on telegram
Telegram
Share on email
Email
Share on twitter
Twitter

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts

Latest Jobs

সকল কবি সাহিত্যিক লেখকের সাহিত্যকর্ম মনে রাখার উপায় !

সকল কবি সাহিত্যিক লেখকের সাহিত্যকর্ম মনে রাখার উপায় ! ইসমাইল হোসেন সিরাজীর উপন্যাস মনে রাখার সহজ উপায়: রানুর ফিতা ১। রা – রায় নন্দিনী ২।

Read More »

সিলেট কর কমিশনারের কার্যালয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি

সিলেট কর কমিশনারের কার্যালয়ে ৭১ জনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত। সিলেট কর কমিশনারের কার্যালয়ে মোট ৯ টি পদে ৭১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। আবেদন শুরু-২৯ ডিসেম্বর

Read More »

প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি

প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ে ৩৮ জনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত। আবেদন শুরু-১৫ ডিসেম্বর, ২০২০ সকাল ১০ টা থেকে। আবেদন শেষ- ৪ জানুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৫ টা। আবেদন করতে

Read More »

শক্তির উৎস

শক্তির উৎস শক্তির প্রধান উৎস (prime sources of energy) সূর্যই প্রায় সকল শক্তির উৎস । এছাড়াও পরমাণুর অভ্যন্তরে নিউক্লিয়াসের নিউক্লিয় শক্তি ও  পৃথিবীর অভ্যন্তরে অবস্থিত উত্তপ্ত গলিত

Read More »

বিশ্বসভ্যতা (A 2 Z)। ২০০ MCQ

বিশ্বসভ্যতা পৃথিবী এ পর্যন্ত পাড়ি দিয়েছে চারটি বরফ যুগ ও চারটি আন্তঃবরফ যুগ। প্রতি যুগেই উষ্ণ অঞ্চলে গিয়ে টিকে থাকা প্রাণীদের দেহের আকৃতিতে কিছু পরিবর্তন

Read More »

সকল কবি সাহিত্যিক লেখকের সাহিত্যকর্ম মনে রাখার উপায় !

সকল কবি সাহিত্যিক লেখকের সাহিত্যকর্ম মনে রাখার উপায় ! ইসমাইল হোসেন সিরাজীর উপন্যাস মনে রাখার সহজ উপায়: রানুর ফিতা ১। রা – রায় নন্দিনী ২।

Read More »

সিলেট কর কমিশনারের কার্যালয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি

সিলেট কর কমিশনারের কার্যালয়ে ৭১ জনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত। সিলেট কর কমিশনারের কার্যালয়ে মোট ৯ টি পদে ৭১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। আবেদন শুরু-২৯ ডিসেম্বর

Read More »

প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি

প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ে ৩৮ জনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত। আবেদন শুরু-১৫ ডিসেম্বর, ২০২০ সকাল ১০ টা থেকে। আবেদন শেষ- ৪ জানুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৫ টা। আবেদন করতে

Read More »

শক্তির উৎস

শক্তির উৎস শক্তির প্রধান উৎস (prime sources of energy) সূর্যই প্রায় সকল শক্তির উৎস । এছাড়াও পরমাণুর অভ্যন্তরে নিউক্লিয়াসের নিউক্লিয় শক্তি ও  পৃথিবীর অভ্যন্তরে অবস্থিত উত্তপ্ত গলিত

Read More »

বিশ্বসভ্যতা (A 2 Z)। ২০০ MCQ

বিশ্বসভ্যতা পৃথিবী এ পর্যন্ত পাড়ি দিয়েছে চারটি বরফ যুগ ও চারটি আন্তঃবরফ যুগ। প্রতি যুগেই উষ্ণ অঞ্চলে গিয়ে টিকে থাকা প্রাণীদের দেহের আকৃতিতে কিছু পরিবর্তন

Read More »